কাপাসিয়ার লোকউৎসব লোকসাহিত্য ও লোকগাথা – অধ্যাপক শামসুল হুদা লিটন

0

gororgari2অধ্যাপক শামসুল হুদা লিটনঃ বাংলাদেশের অধিকাংশ উৎসব এবং লোকউৎসব কাপাসিয়ায় পালিত হয়ে থাকে। কাপাসিয়ায় প্রচলিত লোকায়িত উৎসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৈশাখী মেলা। পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে বৈশাখ মাসজুড়েই এ মেলার আয়োজন হয়ে থাকে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে। বিশেষত কাপাসিয়া বাজার, তরগাঁও, রাউৎকোনা, চাঁদপুর (চানপুর), রাওনাট, আড়াল, চালা বাজার, বারিষাব বাজার, সিঙ্গুয়া বাজার, আড়ালিয়া, গিয়াসপুর, আমরাইদ, টোক, কপালেশ্বর, রায়েদ, সিংহস্ত্রী, ত্রিমোহনী, পানবরাইদ কালিবাড়ী, ঘিঘাট, নাশেরা বটতলার মেলাসহ উপজেলার সকল হাট-বাজার এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে প্রতি বছরই মেলা হয়ে থাকে। বৈশাখী মেলাকে কেউ কেউ বৈশাখের মেলা, বৈশাখী মেলা বা বাংলা নববর্ষের মেলা বলে থাকেন। এর আরো অনেক নাম আছে স্থানীয়ভাবে। কাপাসিয়ার হাটে, বাজারে এবং নানান স্থানে দোকানপাটে ব্যবসায়ীরা বাংলা নববর্ষে হালখাতা অনুষ্ঠান করে থাকেন। বাংলা নববর্ষে গ্রামের প্রতিটি ঘরেই পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে। কোথাও কোথাও পান্তা-ইলিশ খাওয়ার আয়োজন হয়ে থাকে। গ্রামের কৃষক পরিবারগুলো পহেলা বৈশাখে নানা ধরনের ভর্তাসহ একটু ভালো খাবারের ব্যবস্থা করে থাকে। বৈশাখী মেলায় শিশু-নারী-পুরুষের ভিড় জমে। মেলায় বিভিন্ন ধরনের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি হয়। অনেকেই বৈশাখী মেলা থেকে এসব জিনিস কিনে থাকেন। জিলেপি বৈশাথের অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
চৈত্র মাসে কাপাসিয়ায় কোথাও কোথাও চৈতালী মেলা বা চৈত্রসংক্রান্তি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বই মেলা, বই উৎসব, পিঠা উৎসবসহ বিভিন্ন প্রকৃতির উৎসব ও লোকউৎসব আয়োজন হয়ে থাকে এই অঞ্চলে। আশঙ্কার কথা এই যে, কাপাসিয়ার কোনো কোনো এলাকায় বড় মাপের উৎসব বা লোকউৎসব চলার সময় জুয়া, হাউজি, মদ, গাঁজাসহ নানা ধরনের অশ্লীলতা ও অসামাজিক কর্মকা- চলতে দেখা যায়, যা বাঙালির হাজার বছরের এ সংস্কৃতিকে ম্লান করে দিচ্ছে। এ বিষয়ে সবারই সোচ্ছার হওয়া উচিত।
পারিবারিকভাবে পৌষ ও নবান্ন উৎসব পালন করা কাপাসিয়ার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। নতুন ধান উঠা উপলক্ষে কৃষকের ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসব পালিত হয়। পৌষ ও নবান্নোৎসবে বিভিন্ন রকমের মিস্টান্ন পিঠাসহ মুখরোচক খাবার রান্না করার ধুম পড়ে। ঢেঁকি, ছিয়াইট, গাইলের সাহায্যে চালের গুঁড়া তৈরি করা হয়। এসময় প্রায় বাড়িতেই ঢেঁকি, ছিয়াইট, গাইলের শব্দ পাওয়া যায়। বর্তমানে গুঁড়া তৈরিতে এসবের ব্যবহার কমে গেছে। চালের গুঁড়া দিয়ে খেজুরের রস, আইড্ডা কলা (বিচি কলা), নারিকেল, গুড়, দুধ মিশিয়ে চুই পিঠাসহ নানা জাতের পিঠা তৈরি করা হয়। পৌষ মাসে চালের গুঁড়া দিয়ে খেজুরের পিঠা, নারকেল পিঠা, ভাপা পিঠা, কলা পিঠা, দুধরাজ পিঠা, তেলের পিঠা, পাটিসাপটা পিঠা, চিতই পিঠা, পুলি পিঠা, মালপোয়া, ধুফি পিঠা, মেরা পিঠাসহ খৈ-মুড়ি দিয়ে মোয়া বানানো হয়।

liton

অধ্যাপক শামসুল হুদা লিটন

বলা হয়ে থাকে, পিঠার এলাকা কাপাসিয়া। এখানে হরেক রকম পিঠার বাহারি উপস্থাপন ও আধিক্য দেখা যায়। মিষ্টি, ঝাল, টকসহ বিভিন্ন স্বাদের পিঠা এই অঞ্চলে তৈরি করতে দেখা যায়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ভেজিটেবল ঝাল পিঠা, ছাঁচ পিঠা, ছিটকা পিঠা, চুটকি পিঠা, চাপড়ি পিঠা, চাঁদ পাকন পিঠা, ছিট পিঠা, সুন্দরী পাকন, সরভাজা, পুলি পিঠা, পাতা পিঠা, পাটিসাপটা, পাকান পিঠা, পোয়া পিঠা, পানতোয়া, পুডিং, মালপোয়া, মেরা পিঠা, মালাই পিঠা, মুঠি পিঠা, আন্দশা, কুলশি, কাটা পিঠা, ক্ষীর কুলি, গোকুল পিঠা, গোলাপ ফুল পিঠা, লবঙ্গ লতিকা, রসফুল পিঠা, জামদানি পিঠা, হাঁড়ি পিঠা, ঝালপোয়া পিঠা, ঝুরি পিঠা, ঝিনুক পিঠা, সূর্যমুখী পিঠা, নকশি পিঠা, নারকেল পিঠা, নারকেলের ভাজা পুলি, নারকেলের সেদ্ধ পুলি, নারকেল জিলাপি, তেজপাতা পিঠা, সন্দেশ পিঠা, ফুল ঝুরি পিঠা, ফুল পিঠা, বিবিয়ানা পিঠা, সেমাই পিঠা, চিড়ার মোয়া, কাউনের মোয়া, ঝাল মোয়া, ফিরনি, সেমাই, নারকেল নাড়ু, কালাই পুড়ি, সরল পিঠা প্রভৃতি। বাড়িতে মেহমান এলে নতুন ধানের পিঠা দ্বারা আপ্যায়ন করার রেওয়াজ রয়েছে। নবান্নোৎসবে ‘নাইয়র’ যাওয়ার প্রথা অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে উপজেলার বাঘুয়া, কুশদী, সালদৈ, শ্যামপুর, নাশেরা, রাওনাটসহ অনেক গ্রামে এখনো নাইয়র যাবার রেওয়াজ বা রসম লক্ষ্য করা যায়।
মেঘমাগা বা মেঘমাঘন কাপাসিয়ার একটি লোক ঐতিহ্য। আজকাল মেঘমাগা তেমন দেখা যায় না। অনাবৃষ্টি ও খরা (খড়া) দেখা দিলে গ্রামের বয়স্ক, যুবক, কিশোর, শিশুরা কৃষকের বাড়ি বাড়ি ঘুরে গায়ে কাদা মেখে উঠানে উঠানে একসাথে, ‘আল্লাহ মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দেরে তুই আল্লাহ মেঘ দে’, বলে গান গেয়ে মাতম করতো। সিঙ্গা, ভাঙা কুলা, ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল, ঢোল, ঝুড়ি, মুখোশ, বস্তা ইত্যাদি নিয়ে সন্ধ্যা থেকে রাত ২/৩টা পর্যন্ত সামান্য পানি নিয়ে কাদা করে মেঘের জন্য প্রার্থনা করতো। এই প্রার্থনাকে স্থানীয়ভাবে মেঘমাগা বা মেঘমাঘন বলা হয়। মেঘমাগার সময় তাদের ওপর পানি ঢেলে দেয়া হতো। মেঘের গান গাওয়ার পর তাদের চাল, ডাল, লবন, পেঁয়াজ ও নানা উপকরণ সরবরাহ করা হতো। পরে মেঘমাগার দল এসব রান্না করে খেয়ে আনন্দ পেতো। সেই মেঘমাগার পরিবর্তে সম্প্রতি এই অঞ্চলে ব্যাঙের বিয়ে নামে একটি আচার শুরু হয়েছে। প্রচ- গরম আর রোদের খরতাপে অতিষ্ঠ জনজীবনে কাক্সিক্ষত বৃষ্টির আশায় আয়োজন করা হয় ব্যাঙের বিয়ে। দিনভর নেচে গেয়ে আনন্দ ফূর্তি করে নানান আঞ্চলিক গানের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করে ব্যাঙের বিয়ের এই আয়োজন। কেউ কেউ এই আচারকে কুসংস্কার মনে করেন এবং তা বর্জন করে চলেন।
মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসব হলো ঈদ। দেশের অন্যান্য এলাকার মতোই কাপাসিয়ার মুসলিম সম্প্রদায় এক মাস সিয়াম সাধনা শেষে ঈদুল ফিতর পালন করে। এখানকার লোক সমাজে পুরো রমযান মাসেই প্রতিদিন ইফতারের সময় বিভিন্ন ইফতারসামগ্রী নিয়ে ইফতার মাহফিলের আয়োজন হয়ে থাকে। প্রতিটি পরিবারেই ইফতারের সময় উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। পূর্বে গ্রামের বাজার থেকে ফেরা হাটুরেদের ইফতার করানোর জন্য ধর্মপ্রাণ মানুষ মুড়ি, শরবত, পানি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতো। অপরকে ইফতার করিয়ে নিজেরা স্বর্গীয় আনন্দ অনুভব করতো। রাতে সেহরীর সময় মানুষকে ‘চোঙ্গা’ ফুঁকিয়ে কিংবা বেল বাজিয়ে মুসল্লীদের সেহরীর সময় হয়েছে বলে বলে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা হতো। বর্তমানে কাপাসিয়া অঞ্চলে এ দৃশ্য চোখে পড়ে না। আজকাল মসজিদের মাইক থেকে হুইসেল বাজিয়ে কিংবা মাইক দিয়ে মানুষকে ডেকে সেহরীর সময়ের খবর জানানো হয়। রোজার শেষে ঈদ উৎসবে মেতে ওঠেন সবাই।
ঈদুল ফিতরের প্রায় আড়াই মাস পর কুরবানীর ঈদ বা ঈদুল আযহা উদযাপিত হয়। কাপাসিয়া উপজেলার বেশিরভাগ মুসলিম কুরবানী দিয়ে থাকে। তাছাড়া মুসলিম সমাজে ঈদে মিলাদুন্নবী, মহররম, আশুরা, শবেমেরাজ, শবেবরাত, শবেকদর উপলক্ষে নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে থাকে। তাছাড়া মুসলিম সমাজে জন্মদিন, আকিকা, খৎনা, বিয়ে উপলক্ষেও অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। একসময় এলাকার হাজম (স্থানীয় ভাষায় গুণীল) তারাই ছেলেদের খৎনা করতেন। বর্তমানে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের দ্বারা খৎনা করা হচ্ছে। এর ফলে হাজমদের প্রভাব কমে গেছে এবং তাদের পেশারও পরিবর্তন ঘটেছে। গ্রাম এলাকায় খৎনাকে মুসলমানি বলে অভিহিত করা হয়।
কাপাসিয়ার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা শারদীয় দুর্গোৎসব অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করে থাকে। শারদীয় দুর্গোৎসব হলো তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব। তাছাড়া দুর্গাপূজা, সরস্বতীপূজা, কালীপূজা বা শ্যামাপূজা, চড়কপূজা, কুমারীপূজা, ঘরপূজা, মন্দিরপূজাসহ বিভিন্ন পূজা বা পূজা, রথযাত্রা, দোলযাত্রা, শিবরাত্রি, দোলপূর্ণিমা, গণেশ চতুর্থী, অন্ন প্রাসন্ন, জন্মাষ্টমী, চৈত্রসংক্রান্তি উৎসবও পালিত হয় কাপাসিয়ায়। পূজায় বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে থাকে। অন্য ধর্মের লোকজনও এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বারো মাসে তের পার্বণ পালন করে থাকে। বিবাহ, জন্ম, মুখেভাত উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন সময় কীর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এসব কীর্তন কয়েকদিন পর্যন্ত হয়ে থাকে।
অষ্টমী স্নান হিন্দুদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। ব্রহ্মার কৃপা চেয়ে জগতের যাবতীয় সঙ্কীর্ণতা ও পঙ্কিলতার আবরণ থেকে মুক্তির বাসনায় দুর্গাপুর ইউনিয়নের রাণীগঞ্জ বাজারের পূর্বপার্শ্বে ব্রহ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নান করে থাকেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। অষ্টমী স্নানের দিনে হাজারো পুণ্যার্থীর পদচারণায় মুখরিত থাকে হিন্দু সম্প্রদায়ের এই তীর্থস্থানটি, যা ঘিঘাট অষ্টমী স্থান হিসেবে সুখ্যাত। অষ্টমী স্নানকে কেন্দ্র করে ঘিঘাট বটতলায় বিশাল মেলা বসে। কাপাসিয়া (গাজীপুর), মনোহরদী (নরসিংদী) ও শিবপুর (নরসিংদী) তিন উপজেলার মোহনায় অবস্থিত বটতলার মেলায় বসে দেবদেবীর মূর্তি, পুতুল, বাঁশের বাঁশিওয়ালা, ফেরিওয়ালা, নানান ধরনের খেলনা, মাটির তৈরি হাঁড়ি, থালা, বদনার দোকানসহ হরেক রকমের দোকানপাট। বিশেষ করে কাঠের তৈরি আসবাবপত্রের জন্য মেলাটি প্রসিদ্ধ।
বাংলাপিডিয়া তথ্যানুযায়ী, কাপাসিয়া উপজেলায় হিন্দু-মুসলিম পাশাপাশি বসবাস করে অল্প সংখ্যক বৌদ্ধও। এ উপজেলায় সাঁওতাল, কোচ (রাজবংশী), মান্দি প্রভৃতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। এছাড়া কাপাসিয়া, তরগাঁও, ঘিঘাট, ফুলবাড়িয়া, পাবুর, সূর্য্যনরায়পুর, খিরাটি, আমরাইদ, টোকসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ক্ষুদ্র পরিসরে মুচি সম্প্রদায়ের লোকেরা বসবাস করে থাকে। তাদেরও রয়েছে কিছু নিজস্ব উৎসব। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তারা উৎসবগুলো ধুমধামভাবে পালন করতে পারে না। একসময় তাদের বাহারি অনুষ্ঠানে এলাকা সরগরম হয়ে থাকতো। কালের বিবর্তনে হালে কাপাসিয়ায় অনেক আদিবাসী বা নৃ-তাত্ত্বিক হিন্দু পরিচয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে দেখা যায়।
কাপাসিয়ার পাড়া-মহল্লায় মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্যোগে বিভিন্ন সময়, বিশেষ করে শীতকালে ওয়াজ মাহফিল আয়োজন হয়ে থাকে। এখানকার সমাজ ব্যবস্থায় উরস শরীফের আমেজও লক্ষণীয়। এক এক মাজার বা দর্গার আদর্শ কিছুটা আলাদা বুঝাতে গিয়ে ‘উরস’ শব্দটাও বিভিন্ন বানান বনে গেছে। ওরছ, ওরস, ওরশ, উরস, উরশসহ আরো কিছু বানান ও ব্যবহার প্রচলন আছে। কাপাসিয়ার বিয়ে অনুষ্ঠানে কতিপয় লোকাচার পালিত হয়; যেমন বিবাহের পূর্বে পানচিনি, গায়ে হলুদ, মেহেদীতোলা, বরণ ডালা, হলুদ রং মাখামাখি ইত্যাদি। বিয়েকালীন বরবরণ, পালকি বা গাড়ি সাজানো, বরযাত্রা এবং বিয়ের পরে বধূবরণ, বাসরঘর সাজানো, বৌভাত উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বর্তমানে বিয়ে পালকির প্রচলন নেই বললেই চলে।
কাপাসিয়া লোকসাহিত্য
কাপাসিয়া এলাকায় লোক সাহিত্য চর্চা আরম্ভ হয় প্রাচীনকাল থেকে। লোকসাহিত্য কাপাসিয়ার সাহিত্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। যদিও এর সৃষ্টি ঘটেছে অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রসার ঘটেছে মৌখিকভাবে, তথাপি বাংলাসাহিত্যকে এ লোকসাহিত্য ব্যাপ্তি প্রদান করেছে, করেছে সমৃদ্ধ। পৃথক পৃথক ব্যক্তি-বিশেষের সৃষ্টি পরিণত হয়েছে জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যে যার মাধ্যমে প্রকাশ ঘটেছে ভালোবাসা, আবেগ, অনুভূতি ও চিন্তা চেতনার। এদিক থেকেও কাপাসিয়া অঞ্চলের মানুষ কখনো পিছিয়ে ছিল না। অতীতকাল থেকেই এ জনপদে বিভিন্ন ধরনের লোকসাহিত্যের প্রভাব বিদ্যমান। জারি গান, মারফতী গান, কবিগান, পালাগান, গ্রাম্য কিচ্ছার প্রচলন ছিল কাপাসিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে। বেহুলা বা বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর, চাঁদ সদাগর উপাখ্যান কাপাসিয়ার কে না জানে? দেওয়ানদের কিচ্ছা, জমিলার কিচ্ছা, মধু মালা, বায়ান্নসাফা রূপকথা ছিল কাপাসিয়ায় খুবই জনপ্রিয়। পাল্টাপাল্টি কিচ্ছা বা লোকগল্প চলতো গভীর রাত পর্যন্ত। মানুষ হেসে কুটিকুটি হতো। বর্তমানে এসব কমে গেলেও অনেক এলাকায় এখনো দেখা যায়। সেসঙ্গে পুঁথি সাহিত্য এই অঞ্চলে পূর্বে খুবই জনপ্রিয় ছিল। সোনাবানের পুঁথি, মোছন্দালীর পালা, গাজী কালু-চম্পাবতির পুঁথি, সয়ফুল মুল্লুক বদিউজ্জামান, হাশেম কাজীর পুঁথি, জংগনামা, গফুর বাদশা, বানেছা পরীর পালা, ভাওয়াল সন্যাসীর পালা প্রভৃতি এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য পুঁথি সাহিত্য।
এক সময় প্রায় এলাকায়ই পুঁথি সাহিত্যের আসর বসতো। পুঁথিকারগণ ধর্মীয় আবেগে সোনাবানের কাহিনী, ইউসুফ-জোলেখার কাহিনী, কারবালার ইমাম হাসান-হোসাইনের মর্মান্তিক কাহিনী পুঁথির মাধ্যমে সুর ধরে মানুষের সামনে তুলে ধরতো। মানুষ আবেগাপ্লুত হয়ে উঠতো। অনেক আবেগবান মানুষ সেগুলো শোনে কেঁদে উঠতো। বর্তমানে পুঁথি সাহিত্যের আসর আর চোখে পড়ে না। উপজেলার দুর্গাপুর, চাঁদপুর, টোক, বারিষাব, রায়েদ, সিংহস্ত্রী, ঘাগটিয়া, তরগাঁও, কড়িহাতা, সনমানিয়া ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের প্রায় গ্রামেই পুঁথি ও কবিগানের আসর বসতো। বহুল প্রচলন ছিল বাউল গান, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, গম্ভীরা, ঘাটু গান, যাত্রা গান , ঝুমুর গান, জাগের গান প্রভৃতি।
তবে এখনো কাপাসিয়ার বিভিন্ন জায়গায় বাউল গান, জারি, মারফতী ও পালা গানের আয়োজন হয়ে থাকে। এখনো কাপাসিয়া উপজেলার মানুষ বাউল গান, জারি, মারফতী ও পালাগানের ভক্ত। বিশেষ করে শীতকালে ঘটা করে এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে দেখা যায়। সারা রাত ব্যাপী চলে মারফতী ও পালাগানের আসর। মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো এসব শোনে। অনুষ্ঠানে নারী-পুরুষের ব্যাপক সমাগম হয়। অবশ্য বর্তমানে পুঁথি ও কবিগানের আসর তেমন দেখা যায় না। কিন্তু কোনো কোনো গ্রামে বয়স্ক মুরব্বীরা বাড়িতে বসে এখনো সুর করে পুঁথি পাঠ করে থাকেন। এই অঞ্চলের অন্যতম বিখ্যাত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হলো গাজীর গীত। মুসলমানরা ধর্মীয় ভাবধারায় এই গাজীর গীত গেয়ে বেড়াতেন। পূর্বে সমগ্র গাজীপুর অঞ্চলে গাজীর গীতের প্রচলন ছিল। বাংলার সুলতান সিকান্দর শাহের প্রথম পুত্র গাজীর জীবন কাহিনী নিয়ে এই গীত রচিত হয়। পর্যায়ক্রমে যা অনেকের পেশায় পরিণত হয়। বর্তমানে মাঝে মধ্যে কাপাসিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত পল্লী অঞ্চলে গাজীর গীত অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে থাকে। উল্লেখযোগ্য গাজীর গীত হলো-
দেওয়ানী, কোন গুণে তারাইয়া লও,
ভাই, গাজীর নামে,
গাজী কালু দ্ইু ভাই আড়াঙ্গি উড়াইল।
জংলায় যত বাঘ দৌড়িয়ে পালাইলো।”
একসময় জোগালীরা পাট-ধান ক্ষেত নিড়ানের সময় দল বেঁধে উচ্চস্বরে সারি গানের সুরে মন্দ্রিত হতো সারা মাঠ। গাড়িয়াল, শ্রমিক ও কর্মজীবীদের মাঝে বিশেষ জনপ্রিয় হওয়ায় সারি গান ‘শ্রম-সঙ্গীত’, ‘কর্ম-সঙ্গীত’ বা ‘ছাদ পেটানোর গান’ নামেও পরিচিত। সারি গান নৌকার মাঝি-মাল্লাদের সঙ্গেই বেশি যায়। নৌকার মাঝি, কর্মজীবী ও শ্রমিকরা দলবদ্ধভাবে বা সারিবদ্ধভাবে কাজের তালে তালে শ্রম লাগব করার জন্য এ গান থেকে থাকে। এজন্যই এ গানের নাম হয়েছে ‘সারি গান’। খেটে খাওয়া মানুষদের কাছে এ গানের এক বিশেষ মহত্ব রয়েছে। কারণ এ গানের মাঝে শ্রমিকরা কাজের উদ্যম ও শক্তি ফিরে পায়।
আহ! কী মজা ছিল বৈঠকি গান। পাড়া-মহল্লায়, বটতলায়, টেক ভূমিতে আয়োজন হতো বৈঠকি গানের। সে গানের মধ্যে ছিল বিচ্ছেদ, মুর্শিদী, গওর, কৃঞ্চবিচ্ছেদ, রায় বিচ্ছেদ, মওত নামা প্রভৃতি। এসব বৈঠকি গানের ছিল আলাদা আলাদা মনমাতানো সুর। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বৈঠকি গানের প্রতিযোগিতা হতো। বিভিন্ন গ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে ছিল বৈঠকি গানের দল। কখনো কখনো আট-দশটি দল থেকে বছাই করে ফাইনালের দিন সেরা দুটি দল রাখা হতো। পুরস্কার হিসেবে দেয়া হতো সীল, গরু, ছাগল।
কৃষক-শ্রমিক তথা জোগালীরা রাতের খাবারের পর কৃষকের উঠানে বসে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের পুঁথি পাঠ ও বৈঠকি গান পরিবেশন করে মানুষকে আনন্দ দিতো। পাড়ার নারী-পুরুষ উঠানের চারিপাশে পাটি ও পিড়িতে বসে এসব শোনতো। হাল আমলে কৃষকদের একত্রে জোগালী করতে দেখা যায় না। এক সময় গ্রাম এলাকায় কিচ্ছারও আসর বসতো। কাপাসিয়া দুর্গাপুর ইউনিয়নসহ প্রায় সব ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে জারী ও বৈঠকি গানের ব্যাপক বিকাশ লাভ করেছিল। গড়ে উঠেছিল গ্রামভিত্তিক পৃখক পৃখক দল।
নাশেরা গ্রামের মরহুম মাইনুদ্দিন সর্দার, মরহুম আঃ আউয়াল, মরহুম উমর আলী, মরহুম আলী আকবর, ঘিঘাট গ্রামের মরহুম রিয়াজ উদ্দিন হাজী, বেগুনহাটি গ্রামের মরহুম আঃ রশিদ, মরহুম কফিল উদ্দিন, লক্ষ্মীপুর গ্রামের মরহুম আলফাজ উদ্দিন, মরহুম করম আলী, একডালা গ্রামের মরহুম ইউছুফ আলী, দুর্গাপুর গ্রামের আহসান উল্লাহ আশনু, আঃ মজিদ সহ অনেকেই জারি, বৈঠকি ও জোগালী গানের সাথে জড়িত ছিল। বর্তমানে এসব এলাকায় জারি গানের সে ঐতিহ্য না থাকলেও তাদের পরবর্তী প্রজন্ম কিছুটা হলেও ধরে রেখেছেন। এখনো নাশেরা গ্রামে জারি ও বৈঠকি গানের একটি দল রয়েছে। নাশেরা গ্রামের মরহুম মাইনুদ্দিন সর্দারের পুত্র আঃ রহমান দুলার নেতৃত্বে জারি ও বৈঠকি গানের দলের অন্যান্য সদস্য হলেন- ওসমান, আঃসামাদ, হেলাল উদ্দিন, সিদ্দিকুর রহমান, আঃ হাকিম, বাতেন, মোমতাজ প্রমুখ। কাপাসিয়া গ্রাম অঞ্চলে ধান কাটার সময় নানা ধরনের পল্লী গীত গাওয়া হয়। এতে একজন হাল ধরে বাকিরা ধরে দোহার। ধান কাটতে ফূর্তি করা আর কাজের উৎসাহের জন্য এই গান গাওয়া হয়। যেমন-
আমার চেংড়া বন্ধুর গলায় গেন্দা ফুলের মালা
ধান কাটাতে আইলে পড়ে, গায় ধরে জ্বালা !
ওরে হের গলায় ঝলাও ধানের আডির মালা।”
এক সময় হাট-বাজারে সুর তুলে পাঠ করা হতো ছন্দমালা। এলাকার চাঞ্চল্যকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে চারণ কবি বা লোক কবি ছন্দে ছন্দে সাজিয়ে তুলতো এসব কাহিনী। এই কাহিনী সুর তুলে গেয়ে গেয়ে কাহিনীর ছাপানো কপি বিক্রি করা হতো। সর্বশেষ কালীগঞ্জের এমদাদ হোসেন এমদুর ফাঁসি হলে কাপাসিয়ার হাট-বাজারে এমদুর রোমাঞ্চকর কাহিনী নিয়ে ছাপানো ছন্দমালা সুর তুলে বিক্রি করতে দেখেছেন লেখক। লোক ছড়া কাপাসিয়া উপজেলার লোকসাহিত্যের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। উপজেলার সর্বত্র লোক ছড়ার প্রচলন বহু প্রাচীনকাল হতে। আনুষ্ঠানিক জগৎ, মানবজীবন, কৃষি বা জলবায়ু , বর্ষা, আবার অনানুষ্ঠানিক ছেলে ভুলানো, শিশু ভয় দেখানো, দাম্পত্য জীবন, খেলা ও কৌতুক প্রভৃতি নিয়ে নানা ধরনের ছড়া রয়েছে। এরকমই একটি ছড়া-
শোন ছেরি কই তোরে
শ্যাম, পিরিতি করিছ না,
হায় পিরিত তোরে ছারব না।’
লোকগাথা
কাপাসিয়া অঞ্চলে বিভিন্ন লোকগাথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। লোকগাথা (Folklore) হচ্ছে সেসমস্ত গল্প বা কাহিনী, যা মানুষের মুখে মুখে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাড়ি দিচ্ছে। এটাকে আমরা ভিন্নভাবে বলতে পরি, Folklore is the traditional and common beliefs, practices and customs of a people, which are passed on as a shared way of life, often through oral traditions such as folktales, legends, anecdotes, proverbs, jokes and other forms of communication; সুতরাং বিষয়, অর্থ এবং গঠনের ওপর ভিত্তি করে লোকগাথা হতে পারে রূপকথা, কিচ্ছা-কাহিনী, মিথ, ভূত-পেত্নীর গল্প, অ্যাডভেঞ্চার গল্প, বীরত্বের গল্প, ঐতিহাসিক গল্প, মনীষীদের গল্প এবং আরো অনেক কিছু।
কাপাসিয়া এলাকায় গল্পের চরিত্রগুলো অনেকটা ভাগ্যনির্ভর এবং গল্পগুলোতে জ্ঞান, বুদ্ধির বদলে অবৈজ্ঞানিক চিন্তা-চেতনা, জাদুকরী শক্তি, কল্পঘটনার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। স্থানীয় লোকগাথা বা লোকজ উপাখ্যানে ভূত-পেত্নীর অবস্থানও কম যায় না। এসব গল্পে ভূত হলো অশরীরী পুরুষ আত্মা আর পেত্নী অশরীরী মেয়ে আত্মা। শাকচুন্নি পেত্নী, চোরাচুন্নি পেত্নী, মেছোভূত, পেঁচাপেঁচি ভূত, ব্রহ্মদৈত্য, স্কন্ধকাটা বা কন্ধকাটা ভূত, আলেয়া পেত্নী, নিশি ভূত ইত্যাদি লোমহর্ষক লোকজ গল্প করতে প্রায় পরিবারেই শোনা যায়। অপরদিকে কিছু গল্প বা কাহিনীতে দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, হালচিত্র ফুটে উঠেছে। তবে বর্তমানে কাপাসিয়া উপজেলায় আধ্যাত্মিক বিষয়াদি নিয়ে লোকজ বিশ্বাসের চর্চা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।
ভাওয়াল রাজ সন্নাসীর কাহিনী, ভূতের বাজারের কাহিনী, তারাগঞ্জ রায়ের বাড়ির কাহিনী, রাজা শিশুপালের কাহিনী, রানী ভবানীর কাহিনী, পাহলোয়ান শাহ্ গাজী, ফজল গাজী, বাহাদুর গাজীসহ গাজী বংশের কাহিনী, ঈসা খাঁ-মানসিংহের কাহিনী লোকমুখে প্রচলিত আছে। একডালা দুর্গ, দরদরিয়া দুর্গ, টোক শহর, থানার টেক, কামারগাঁও, লোহাদী, রানীগঞ্জের কুঠিবাড়ির নানা উপাখ্যান এখনো কাপাসিয়ার সমাজে প্রচলিত। কালীগঞ্জের চৌরার সুুফি সাধক ও যোদ্ধা কারফরমা শাহ্, ভারতের জৈনপুরের পীর মাওলানা কেরাম আলী (রহঃ) এর অলৌকিক কর্মকা- এবং আউলিয়া কেরামের এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের কথা এখনো বংশ পরমপরায় লোকমুখে শোনা যায়।
কাপাসিয়ার লোকযান
কাপাসিয়া অঞ্চলে একসময় স্থলপথে গরুর গাড়ি ও জলপথে নৌকা ছিল প্রধান যানবাহন। ধনী ও উচ্চবংশের মহিলারা অনেক সময় পালকিতে (Palanquin) চলাচল করতেন। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ কিংবা যাতায়াতের জন্য পালকি ব্যবহৃত হতো। মুচি সম্প্রদায়ের লোকজন ঘাড়ে করে পালকি বহন করতেন। পালকি বহনকারীরা এলাকায় পালকি বেহারা নামে পরিচিত। বিয়ের প্রধান যান ছিল পালকি। গরুর গাড়ি ও পালকি দিয়ে নতুন বউ আনা হতো। বিয়ে উপলক্ষে পালকি ও গরুর গাড়ি নতুন কাপড় দিয়ে মোড়ানো হতো। বরযাত্রী ও আত্মীয়-স্বজন গরুর গাড়ি ও পালকির পেছনে পেছনে হেঁটে চলতো। পথিমধ্যে ক্লান্ত-শ্রান্ত বেহারা রাস্তার পাশে কোনো গাছের ছায়ায় জিরানোর (বিশ্রামের) জন্য বসতো। হালকা খাবার খেয়ে ও হুক্কা টেনে আবার পথ চলতো। এ সময় গ্রামের উৎসুক মানুষ দাঁড়িয়ে নতুন বউ যাওয়ার দৃশ্য দেখতো। আধুনিকতার ছোঁয়ায় পালকি আজ বিলুপ্ত।
শীতলক্ষ্যা, ব্রহ্মপুত্র, বানার নদী দিয়ে গয়নার নৌকা, পালতোলা নৌকাসহ নানা ধরনের নৌকা চলাচল করতো। গয়না নৌকা দিয়ে মানুষ বহুদূর পর্যন্ত যাতায়াত করতো। কাপাসিয়ার রাণীগঞ্জ, তারাগঞ্জ, লাখপুর, আড়াল, সাফাইশ্রী, তরগাঁও, দরদরিয়া, সিংহগ্রী, টোক, বারিষাব, আড়ালিয়া স্থান থেকে গয়না নৌকা ছাড়া হতো। এ গয়না নৌকা দিয়ে মানুষ ঘোড়াশাল হয়ে ঢাকা শহরে যেতেন। ভোর রাতে গয়না নৌকা ছাড়া হতো। এ নৌকাতে খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রাম ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা ছিল। আশির দশকে এসে গয়না নৌকা কমতে শুরু করে। নদীতে এখন আর পাল তোলা নৌকা ও গয়না নৌকা দেখা যায় না। একসময় শীতকালে নদীর তীর দিয়ে দাঁড় টেনে মাঝি-মহাল্লারা নৌকা বয়ে নিয়ে যেতো। এখন সেই নৌকাও নেই, দাঁড় টানার দৃশ্যও নেই।
ঘোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়ি, মহিষের গাড়ি, নৌকা এখনো বিলীন হয়ে যায়নি। তবে যানবাহন হিসেবে পালকি ও গয়না নৌকা বিলীন হয়ে গেছে। বেড়াতে যাওয়ার সময় বাহন হিসেবে গরু-মহিষের গাড়ি ব্যবহৃত হতো। গরুর গাড়ি দিয়ে মাঠ থেকে ধানের বোঝা আনা হতো। বাগান থেকে কাঁঠাল, কলা, লিচু ও কৃষি পণ্য হিসেবে ধান, পাট গরুর গাড়িতে ভর্তি করে বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হতো। সাপ্তাহিক হাট-বাজারের দিন রাস্তায় দেখা যেতো গরুর গাড়ির সারি। সে স্থান দখল করেছে রিকশা-ভ্যান, টমটম আর লেগুনা গাড়ি। তবে এখনো বাঁশ, আঁখ ও বিভিন্ন কাঠ গাছ আনানেয়ায় গরু-মহিষের গাড়ি ব্যবহৃত হচ্ছে। গরু-মহিষের গাড়ি চালকরা গাড়িয়াল হিসেবে পরিচিত।
কাপাসিয়ার লোকক্রীড়া
কাপাসিয়ায় বহুকাল ধরে নানা ধরনের লোক ক্রীড়া প্রচলিত রয়েছে। বিভিন্ন গ্রামের অসংখ্য লোক ক্রীড়া এ অঞ্চলের উন্নত সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। প্রচলিত লোক ক্রীড়ার মধ্যে রয়েছে- পুতুল খেলা, পাশা খেলা, চারগুটি, পাঁচগুটি, ষোলোগুটি, বত্রিশগুটি, জোলাবাতি, ঢেঁকিভানা, ঘোড়া খেলা, হাতি খেলা, পলাপলি, চোর-চোর, জোড়-বেজোড়, জলে-ডাঙ্গা, ঠান্ডা-গরম, সুঁই খেলা, গুলী খেলা, লুডু খেলা, বুদ্ধি খেলা প্রভৃতি। তাছাড়া ডাংগুটি বা ডাংগুলী, কানামাছি, গাচ্ছ্যুয়া-মাচ্ছ্যুয়া, ওপেনটি বাইস্কোপ, লাঠি খেলা, চোর-পুলিশ, বৌচি বা বঁইচি খেলা, হা-ডু-ডু, দাড়িয়া বান্দা, নৌকাবাইচ, ষাড়ের লড়াই, গরুর দৌড়, মোরগ লড়াই, পালকি খেলা, কুতকুত বা কিতকিত, গোল্লাছোট, পাতা খেলা, দোলনা খেলা, সাতচারা, মারবেল, আমবড়া, চারা খেলা, পাতিল ভাঙা, রাজকন্যা কার, বউপালানো, দাবা খেলা, টোকা খেলা, কডি খেলা, দড়িলম্ফ বা দড়ি লাফ, সাঁতার, ডুব খেলা, তালপাতার বল খেলা, কচুরিপনার বল খেলা, ঠুল্লুই প্রভৃতি নানা ধরনের লোক ক্রীড়া সমাজে বিদ্যমান। এখনো শিশু-কিশোররা এসব খেলায় মেতে ওঠে। অনেক লোক ক্রীড়াই আজ বিলুপ্তির পথে। শিশুদের মানষিক ও শারীরিক বিকাশে এসব লোক ক্রীড়ার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

Share.

Leave A Reply