আমার আবেগ কেউ বুঝল না

0

অ্যাডভোকেট শরিফ খান:

আমার ভালাগার মানুষগুলোর মধ্যে একজন কবির ভাই (আফজাল কবির, দীপ্ত টিভিতে চলমান মেগাসিরিয়াল ’অপরাজিতা’র প্রধান চরিত্রের অভিনেতা)। ধরণীতে কিছু মানুষ আছে যাদের সাথে কথা বললে আপনার মন ভালো হতে বাধ্য, যাদের সংস্পর্শেFB_IMG_1473700710622 নাটক সিনেমা কিংবা ভালো উপন্যাস পড়ার চেয়ে বেশি বিনোদন দেয়। তিনি তেমনই একজন। তাঁর কথা বলার স্টাইল, বাচনভঙ্গি, নম্রতা সবসময় আমাকে বিস্মিত করে।

ইউনিভার্সিটির হলে আমার জানালার বাইরে একটা দেয়াল ছিল। দেয়ালটা টপকালেই এসএম হল। আমি অবসর পেলেই দেয়াল টপকে চলে যেতাম এসএম হলে। কবির ভাই কিংবা সেলিম ভাইয়ের(বর্তমানে যোগাযোগ নেই) রুমে। সেলিম ভাই ইসলামিক স্টাডিজের ছাত্র হলেও ছিলেন রসিক আর বাকপটু। তিনজন একসাথে হওয়ার সময়গুলো ছিল আমার ক্ষেত্রে স্বরণীয়, মনের ফ্রেমে বাধাঁই করে রাখার মতো। সেলিম ভাই কবির ভাইকে প্রায়ই বলতেন, ভাই একটা অটোগ্রাফ দিবেন? কিংবা বলতেন, ভাই আপনি যতই নাটক শেখান আমরা হলাম আসল অভিনেতা। আমি ছিলাম দুজনের বাকযুদ্ধের নীরব দর্শক। মাঝেমধ্যে বাধ্য হলে তর্কে আমি সেলিম ভাইয়ের পক্ষ অবলম্বন করতাম। কারণ তিনি আমাকে প্রতিদিন নিজহাতে বানানো কফি ঘুষ দিতেন। সেলিম ভাইয়ের রুমে যাদের যাদের চলাচল ছিল তারা এই কফির মজা পেয়ে থাকবেন।

কিছুদিন পর ঝড়ের তাণ্ডবে একটা মস্ত বড় কড়ই গাছ দুই হলের ব্যবধান তৈরী করা পুরাতন দেয়ালের উপর পড়ে দেয়াল ভেঙে যায় । দুই হলের ব্যবধান ঘুচে যায়। মনে হয়েছিল সৃষ্টিকর্তা আমার প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছেন। আমার অসুবিধার কথা চিন্তা করেই দেয়ালটা ভেঙে দিলেন। দিনের অধিকাংশ সময় কাটত এসএম হলে। কখনোবা সন্ধ্যাটাও কেড়ে নিত এসএম হল। FB_IMG_1473700720672

ইউনিভাসিটিতে প্রথম দিকে শৃক্রবারে কবির ভাই আমাকে একরকম কান ধরে টিএসসিতে নিয়ে যেতেন। তিনি আবৃত্তি-অভিনয়ের ক্লাস নিতেন আর আমাকে পেছনে বসিয়ে দিতেন। আমি পেছনে বসে বসে হাসতাম। আর ওরা হাসত আমার গ্রাম্য কথা শুনে। পর্দার অভিনয় আর চাক্ষুস অভিনয় অনেকটা ভিন্ন। পর্দায় যে অভিনয় দেখে আমরা হাসি-কাঁদি, বাস্তবে তা আমাদের যৌক্তিক মনকে কোনভাবে প্রভাবিত করে না। তাই আমি হাসতাম। আর অশুদ্ধ গ্রাম্য কথা শুনে ভাইয়ের ছাত্ররা বলত আমারও সেখানে ভর্তি হওয়া উচিত। মুখে বলি, দেখা যাক। মনে মনে বলি, তোদের এই অকাজে আমি নাই। পরবর্তী সময়ে আমার এক বন্ধ (বর্তমানে সহকারী জজ) জোর করে আবৃত্তি সংগঠন ত্রিলোকে ভর্তি করিয়ে দেয়। অবশ্য বেশিদিন চলেনি আমার অধ্যাবসায়।

আফজাল ভাই অভিনয় শেখাতেন। আমি পেছনে বসে উপভোগ করতাম। তারপর অর্ধেক যুগ কেটে গেছে অবহেলায়। আমার একটা স্বপ্ন ছিল তিনি একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেন মিডিয়া জগতে। আমাদের দেখেও না চেনার ভান করবেন। কিংবা আমাদের সাথে কথা বলার সময় মুখের ভাজ নষ্ট করবেন না। মানুষ বিখ্যাত হলে দূরে চলে যায়, আর এটাই স্বাভাবিক। আমরা তার গল্প করে আত্মপ্রসাদ লাভ করব।
সবকিছু স্বপ্নের মতো হয় না। স্বপ্নদের ধর্মই ভেঙে যাওয়া। জ্ঞানীরা একে বাস্তবতা বলে চালিয়ে দেয়। আমি জ্ঞানী না। তাই বাস্ততাকে সবসময় উপেক্ষা করি। তারপর চলন্ত পথিকের মতো অনেকবার দেখা হয়েছে তাঁর সাথে। কখনো সেন্ট্রাল লাইব্রেরীর গেটে, কখনো জাদুঘরের সামনে, কখনো হাকিম চত্বর কিংবা নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানে। আশাকে আশ্রয় দেবার খবর পেলাম না কখনোই।

এক ঈদে আমি বসে বসে টিভি দেখছিলাম। দেখছিলাম না চ্যানেল চ্যাঞ্জ করছিলাম। চ্যানেল চ্যাঞ্জ করার বিষয়ে বাড়িতে আমার বিশেষ সুনাম রয়েছে। হঠাৎ বাংলাভিশনের চোখ আটকে গেল। কবির ভাই অভিনীত নাটক। আমার মা নাটক সিনেমা তেমন দেখে না। তারপরও আমি জোর করে টানতে টানতে টিভির সামনে নিয়ে আসি। তারপর বলি, কবির ভাইয়ের নাটক। দেখেন বসে বসে। মা বলল, যেভাবে টেনে আনলি মনে হচ্ছে তুই অভিনয় করেছিস। আমি বললাম, আমার কি আর এত যোগ্যতা আছে। মনে মনে বললাম, কিছু মানুষের সাফল্য আমার কাছে আমার সাফল্য থেকে বেশি আনন্দের।

তারপর আরো এক বছর কেটে গেল। স্মৃতিরা সমাহিত হয়েছে সময়ের কবরে। এক বর্ষা বিদায় নিয়ে আবার ফিরে এল। ঋতুচক্র একবার ঘুরে গেল। গত ঈদের আগে হাকিম চত্বরে কবির ভাইয়ের সাথে দেখা। কথা প্রসঙ্গে বললেন, ঈদের দিন আমাদের বাড়িতে আসবে। এরকম কথা অনেকেই বলে। আমিও বলি। তারপর স্মৃতিরা চক্রান্ত করে সব ভুলিয়ে দেয়। যাদের মনে থাকে তারাও ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে আপ্রাণ।
ঈদের দিন সত্যিই কবির ভাই আমাদের বাড়ির কাছে এসে ফোন দেন। কথা প্রসঙ্গে অভিনয়ের খবর জিজ্ঞেস করি। মুখে হতাশার সুর আগেই ছিল। এইবার আরো বেড়েছে। আমি সত্যিই সেদিন আঘাত পেয়েছিলাম তাঁর কথা শুনে। আমার মেধা আর টাকা থাকলে নিজেই নাটক লিখে তা অভিনীত হতো আমার টাকায়। আর তিনি থাকতেন সেই নাটকের নায়ক। দূভার্গক্রমে সৃষ্টিকর্তা সেই ক্ষমতা আমাকে দেননি।
তারপর সময়ের চক্রান্তে সব ভুলে গেলাম। আমি আমার কাজে ডুবে গেলাম। গত চৈত্রমাসে দীপ্ত টিভিতে কবির ভাইকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে গেলাম। আশাপূর্ণা দেবী’র ‘বালুচুরি’ উপন্যাসের ছায়া অবলম্বনে ’অপরাজিতা’ ধারাবাহিকে। ভাবীকে ডেকে আনলাম নাটক দেখার জন্য। দেখতই হবে। কবির ভাইয়ের নাটক। আমার এরকম পাগলামির সাথে বাড়ির সবাই অভ্যস্ত। তাই আর সময় অপচয় না করে একনিষ্ঠ দর্শকের মতো টিভির সামনে এসে বসলেন। আমি অতি আগ্রহ নিয়ে দেখছিলাম বলে ভাবী বললেল, এইটা কোন নাটক হইছে! যতসব আজে বাজে প্যাচাল। দূর, আমার কাজ আছে।
বললাম, ভালো জিনিস তো দেখবেন না। নাচ-গান থাকলে ঠিকই দেখতেন।
তারপর ইট-পাথরের শহর কেড়ে নিয়েছে অনেকটা সময়। সেই বসন্তের দুপুর এসে মিলিয়ে গেল শরতের সন্ধ্যায়ে এসে। গতকাল সন্ধ্যাবেলায় মাসুদ আহমেদের তৈরী তিন নেতার মাজার-এর (শেরে-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর খাজা নাজিমুদ্দিন) পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছিলাম। ভাস্কর্যের সামনে ছোট জটলা। হাতে সময় নেই। তাছাড়া খারাপ কিছু ঘটলেই এরকম জটলা হয়। ভালো কিছু দেখার জন্য মানুষ ভীড় করে না। ভালো কথা কেউ সহজে শুনতে চাই না।
দ্রুত জটলা পেরিয়ে গেলাম। হঠাৎ আমার নাম ধরে কে যেন ডাকল। এদেশে আমার নাম সবচেয়ে বেশি মানুষের। সবচেয়ে কমন নাম আমার। যেকোন স্থানে, যেকোন বয়সের মানুষের নাম আমার নামে হতে পারে। কর্ণপাত না করে এড়িয়ে গেলাম। এখানে আমার পরিচিত কেউ থাকতে পারে না। দ্বিতীয়বার ডাকতেই পেছনে ফিরে দেখি ক্যামেরা সেটের সামনে কবির ভাই। একজন টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে দিচ্ছিল। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে। আমি ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ক্যামেরাম্যান হিংস্র চোখে আমার দিকে তাকায় আমার দিকে। দর্শকদের মধ্যেও কেউ কেউ আমার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আবার দ্রুত দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। তুচ্ছ ব্যক্তিদের দর্শকরাও চিনতে পারে। সবকিছু উপেক্ষা করে আমি বললাম, একটা অটোগ্রাফ দিবেন?

Share.

Comments are closed.